Pages

Friday, April 23, 2021

আলাউদ্দিন-খিলজি

আলাউদ্দিন-খিলজি
(তথ্যসূত্র:
১- The Life and Works of Sultan Alauddin Khalji, Ghulam Sarwar Khan Niazi, Atlantic (২০১৮)।
২- The Reign of Alauddin Khilji, Translated from Zia-ud-din Barani's Tarikh-i-Firuz Shahi By A.R.Fuller and A.Khallaque, Pilgrim Publishers (১৯৬০)।
৩- History of the Khaljis: A.D. 1290-1320, Kishori Saran Lal, Munshiram Manoharlal Publishers (২০১৯)।)



আলাউদ্দিন-খিলজি

ধনী হলেই লোকে রাজা হয়ে যেতেন না। ইতিহাস বলে অনেক ব্যবসায়ী হয়ত রাজার চেয়েও ধনী ছিলেন, কিন্তু তাঁরা রাজা ছিলেন না। ‘রাজা’ বা ‘মহারাজা’ বা ‘সম্রাট’ বা ‘বাদশাহ’ বা ‘সুলতান’ বা ‘নবাব’ হতে হলে নিজের ইচ্ছেকে লাগাম ছাড়া রূপ দিতে পারার মতো মেজাজ থাকার প্রয়োজন ছিল, যেমন ছিল ‘দিল্লির অধীশ্বর’ ‘আলাউদ্দিন খিলজি’র।
‘অতিরিক্ত মদ্যপান’ করবার পরেই ‘আলাউদ্দিন’ খামখেয়ালের রাশ ছেড়ে দিয়ে ‘খোয়াব’ দেখতে বসতেন। আর কেনই বা বসবেন না? সিংহাসন পাবার পর তিনি দেখেছিলেন যে তাঁর কোনও অভাব নেই। তাঁর খাজনা-খানায় দেদার ধনরত্ন, হাতিশালায় অসংখ্য হাতি, ঘোড়াশালায় সত্তর হাজারের বেশি ঘোড়া, হারেম উপচে পড়া রূপসী রমণী; আর তাঁর রাজ্যে আমোদ-প্রমোদ, গম্বুজ তৈরি, জলসার জৌলুস তো লেগেই ছিল। প্রতি বছরই তাঁর দুটি তিনটি করে পুত্র জন্মাত, শহরে বা শহরের আশেপাশে যেখানেই তিনি যেতেন, যেদিকেই তিনি তাকাতেন, দেখতে পেতেন হাজার হাজার লোক হাতজোড় করে তাঁর হুকুম তামিল করবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। তাই এমন মানুষ ‘খামখেয়ালের খোয়াব’ দেখবেন না তো কে দেখবে?
‘আলাউদ্দিনের’ মাথায় দুটো মারাত্মক খেয়াল চেপেছিল। একবার তাঁর মনে হয়েছিল, ‘নবী’র মতো তিনিও একটি ‘নতুন ধর্ম’ প্রচার করবেন এবং ‘তলোয়ারের সাহায্যে’ সবাইকে ঐ ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করবেন। একদিন ‘শরাবের মজলিশে’ বসে তিনি শুধু সেকথা ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি, কেন তাঁর ‘নবী’র মতো ধর্মপ্রচারের খেয়াল হয়েছে সেকথাও তিনি সাড়ম্বরে বলতেন। তিনি গর্বের সাথে বলতেন, ‘‘খোদাতালা নবীকে চারজন বন্ধু দিয়েছিলেন, আমাকেও দিয়েছেন উলুগ খান, জাফর খান, নসরত খান ও আলপ খানকে। এঁদের সাহায্যে, আমি ইচ্ছে করলেই নতুন ধর্মের জন্ম দিতে পারি।’’ নতুন ধর্ম সম্বন্ধে তাঁর ‘জল্পনা’ প্রায়ই শোনা যেত একটিমাত্র কারণে, তাঁর মনে হয়েছিল নতুন ধর্ম যদি সবাইকে জোর করে গ্রহণ করতে তিনি বাধ্য করেন তাহলে আর ভাবনা নেই, তাঁর মৃত্যুর পরেও ‘নবী’র মতোই চিরদিন তাঁর নাম থাকবে। ‘কেয়ামতের সময়’ পর্যন্ত। তাই ‘ইসলাম’ ও অন্যান্য কোন ধর্ম সম্বন্ধে তাঁর কোন আগ্রহ বা জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও তিনি দিনের পর দিন সেটা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন যে, তাঁকে এমন কিছু করতে হবে যার ফলে তাঁর মৃত্যুর পরেও মানুষ নির্বিবাদে সেই ধর্ম গ্রহণ করতে উৎসাহী হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত ‘আলাউদ্দিনের’ সেই খামখেয়াল মেটেনি। কিন্তু যদি সত্যিই তিনি সেই চেষ্টা করতেন? তরবারির সাহায্যে? সেটা চিন্তা করে ‘জিয়াউদ্দিন বারানী’ পর্যন্ত আতঙ্কে শিউরে উঠেছিলেন।
‘আলাউদ্দিনের’ আরও একটা খেয়াল চেপেছিল মাথায়। তাঁর সাধ জেগেছিল ‘বিশ্বজয়ী সিকন্দরের’ মতো ‘দ্বিতীয় সিকন্দর’ হওয়ার। ‘সুলতানের শখ’ বলে তাঁর সামনাসামনি কেউই কোনদিন কোন মন্তব্য করেননি, তবে আড়ালে তাঁর ‘আমির-ওমরাহেরা’ সবাই হেসেছিলেন, সামান্য ‘দিল্লীশ্বর’ হয়ে বিশ্বজয়ের সাধ! ‘আলাউদ্দিন’ অবশ্য বেশ উৎসাহ নিয়েই সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন এবং নিজের চিঠিপত্রে নিজেকে ‘দ্বিতীয় সিকন্দর’ বলে জাহির করতেও ছাড়েননি। ‘শরাবের মজলিশে’ তিনি আস্ফালন করে বলতেন, ‘‘এক একটা দেশ জয় করব আর এক একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর হাতে দিয়ে আরও এগিয়ে যাব।’’ শ্রোতারা সবাই জানতেন, সেটিও ‘আলাউদ্দিনের’ ‘বাজে খেয়াল’, যা কোনদিন সফল হবে না, শুধু তাই নয়, ‘শরাবের নেশা’ কেটে গেলে তিনি নিজেই সেটার অযৌক্তিকতা বুঝতে পারবেন। সেইজন্য ‘মদ্যপানের আসরে’ তাঁরাও ‘সুলতান’কে সেই বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। নানারকম উদাহরণ দিয়ে তাঁরা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে ‘সুলতানের মর্জিমতো’ কথা বলতেন। ‘আলাউদ্দিন’ ‘দিগ্বিজয়ী বীর’ এবং ‘দিল্লির সুলতান’ হয়েও তাঁর সেই শখ দুটিকে সফল রূপ দিতে পারেননি। তিনি সেটা দিতে পারলে হয়ত সত্যিই সর্বনাশা ঘটত।
(তথ্যসূত্র:
১- The Life and Works of Sultan Alauddin Khalji, Ghulam Sarwar Khan Niazi, Atlantic (২০১৮)।
২- The Reign of Alauddin Khilji, Translated from Zia-ud-din Barani's Tarikh-i-Firuz Shahi By A.R.Fuller and A.Khallaque, Pilgrim Publishers (১৯৬০)।
৩- History of the Khaljis: A.D. 1290-1320, Kishori Saran Lal, Munshiram Manoharlal Publishers (২০১৯)।)
 

সত্যজিৎ রায় ও কাঁটা’

(তথ্যসূত্র:
১- সত্যজিৎ: জীবন আর শিল্প, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত, প্রতিভাস।
২- ২- অনন্য সত্যজিৎ, প্রবোধকুমার মৈত্র সম্পাদিত।
৩- সত্যজিৎ স্মরণে, আনন্দলোক পত্রিকা, ২৭শে এপ্রিল ২০১৫ সাল।)
May be an image of 1 person and indoor

‘সত্যজিৎ রায় ও কাঁটা’

বর্তমানে সত্যজিৎ রায়কে সকলেই চেনেন ‘আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান’ একজন ‘চলচ্চিত্রকার’ হিসেবে। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলো ঘিরে আমাদের বিস্ময়, ভালবাসার অন্ত নেই। এই মুগ্ধতার আড়ালে কখন যে চাপা পড়ে গিয়েছে তাঁর ‘সত্যজিৎ’ হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত, মনে রাখিনি আমরা কেউ-ই। তিনি রাতারাতি ‘বিশ্ববরেণ্য’ হয়ে ওঠেননি। তাঁর চলার পথেও ছিল শত সহস্ৰ কাঁটা। যা পোঁতা ছিল তাঁর কাজের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক পরিবেশের মধ্যে। যে ‘ইন্ডাস্ট্রি’তে বসে তিনি কাজ করেছিলেন, সেই ‘ইন্ডাস্ট্রির লোকেরাও’ কিন্তু তাঁকে ছেড়ে কথা বলেননি। আজ সেইসব কাহিনীর কয়েকটিকে যদি স্মৃতি হাতড়ে তুলে আনা হয়, পাঠক অবাক না হয়ে পারবেন না। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলা যাক। সিনেমা বানাতে আগ্রহী হয়ে যাঁরাই ‘চিত্রনাট্য’ লিখছেন, তাঁরা জানেন, ‘চিত্রনাট্য’ লেখার পর সেটাকে কেন্দ্র করে ‘অর্থের বন্দোবস্ত করা’ কতটা কঠিন! বিশেষ করে সেই ‘চিত্রনাট্যের কাহিনী’ যদি ‘বাণিজ্যিক ছবি’র চেনা গণ্ডি ভেঙে অন্য পথে এগতে যায়, তা হলে তো কথাই নেই। ‘ঋত্বিক ঘটকের’ কথায়, ‘‘নতুন চলচ্চিত্রকার যদি নতুন ভাবনা নিয়ে কোনও চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন, তা শোনার মতো মন প্রযোজক প্রজাতির মানুষের সচরাচর থাকে না।’’ তবু যেহেতু ‘প্রযোজক’ না পেলে চলে না, তাই বাধ্য হয়ে তাঁদের ব্যাজার মুখের সামনে বসেই ‘চিত্রনাট্য’ শোনাতে হয়। এমন অভিজ্ঞতা থেকে রেহাই পাননি সত্যজিৎও। ‘পথের পাঁচালী’ করবেন বলে তখন তিনি হন্যে হয়ে ‘প্রযোজক’ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। তাঁর ‘ইউনিটের প্রোডাকশন কনট্রোলার’ ‘অনিল চৌধুরী’ তাঁর এক বন্ধু ‘প্রযোজকের’ (‘কুমুদবন্ধু দাস’) কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিতকে। ‘অনিল চৌধুরী’ পরে লিখেছিলেন, ‘‘সত্যজিৎবাবুকে একদিন কুমুদের কাছে নিয়ে গেলাম শিয়ালদহের আর্যনিবাস হোটেলে ‘পথের পাঁচালী’র স্ক্রিপ্ট শোনানোর জন্য। সত্যজিৎবাবু তাঁর খাতা খুলে পড়তে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর দেখলাম কুমুদ কেমন উসখুস করছে, মোটেই মনোযোগ দিচ্ছে না। স্ক্রিপ্ট পড়া শেষ হয়ে গেল। আমি কিন্তু স্ক্রিপ্ট শুনছিলাম না। আমার মন ছিল কুমুদ ঠিক কী ভাবে ব্যাপারটা নিচ্ছে সেই দিকে। কুমুদের ভাবগতিক দেখে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। স্ক্রিপ্ট শেষ করে সত্যজিৎবাবু চলে গেলেন। আমি কুমুদকে খুব গালাগালি করলাম ওরকম ব্যবহার করার জন্য। কুমুদ বলল, ‘দূর, এ কী স্ক্রিপ্ট হয়েছে? কোনও গান-টান নেই।’ আমি বললাম, ‘গানের সুযোগ কোথায়?’ কুমুদ বলল, ‘কেন, দুর্গা ওরকম মাঠে মাঠে ঘুরত, একটা গান গাইতে পারে না?’ ...’’ আজ সকলেই জানেন যে কীভাবে সত্যজিৎ রায় ‘পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী’ ‘বিধান চন্দ্র রায়ের’ সাহায্যে শেষপর্যন্ত ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির টাকা পেয়েছিলেন ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারের’ কাছ থেকে। সেটাও অনেক বাধাবিপত্তি পার করে। সেই ছবির সাফল্যের পর দ্বিতীয় ছবি তৈরি করতে গিয়ে যে তাঁকে আর যে ভাবতে হয়নি, এমনও কিন্তু নয়। ‘পথের পাঁচালী’ পরবর্তী ‘আগন্তুক’ পর্যন্ত যে ২৮টি ছবি তিনি করেছিলেন, সেগুলোর সবই খুব কম বাজেটে তৈরি করেছিলেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবিতে কাজ করতে এসে সেই বাজেটের ব্যাপারটা চোখ এড়ায়নি ‘ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের’। তিনি লিখেছিলেন, ‘‘অবাক হয়ে যেতাম ওঁর মিতব্যয়িতা দেখে। সব কিছু নিজে করছেন। চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে শিল্প নির্দেশনা, ক্যামেরা, পোশাক ... সব ডিপার্টমেন্টের কাজ নিজে দেখতেন। এমনকী চরিত্রের পোশাকআশাক কী হবে, সেটাও। এটা যদি আই ফর ডিটেলের একটা দিক হয়, অন্যদিকটা মনে হয়, যেন তিনি বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার বলেই বিরাট বাজেট নয়, সেটা বলে দেওয়া। ওঁর চাহিদা ছিল অত্যন্ত কম। যা পেলেন, তাই দিয়েই কাজ চালিয়ে নিলেন। কিন্তু এমন ভাবে নিলেন, দেখে আমরা হতবাক। ক্যামেরা নিজেই চালাতেন। আমাকে বাড়ি থেকে তুললেন, ক্যামেরা তুললেন, আরও দু’একজনকে তুললেন। একটা ভাঙা অ্যাম্বাসেডর। চৌরঙ্গি, লিন্ডসে স্ট্রিট হয়ে জাদুঘরের সামনে হঠাৎ আমায় নিয়ে রাস্তায় নেমে হাঁটতে শুরু করলেন। একটা ডবল ডেকার বাস আসছিল, সেটাকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে আমায় বললেন ‘উঠে পড়ো’। আমি উঠলাম। উনিও উঠলেন ক্যামেরা নিয়ে। শট চলছে কিন্তু। ‘অ্যারিফ্লেক্স’ হালকা ক্যামেরা। সে যুগের ক্যামকর্ডার বলা যেতে পারে। ‘অপরাজিত’ করার আগে ওটি সুব্রত মিত্র আনিয়েছিলেন বলে শুনেছিলাম।’’ এসবই সত্যজিৎ রায়কে করতে হত খরচ বাঁচাতে। তিনি জানতেন, সীমিত বাজেটের মধ্যে কাজ করতে হবে। এই প্রসঙ্গে তাঁর ছেলে ‘সন্দীপ রায়’ অতীতে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন, ‘‘বাবা যে কোনও ভাবে প্রযোজকদের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করবেন, এই বিশ্বাসটা সকলের ছিল। চাইলে অবশ্যই তিনি বেশি অর্থ লগ্নির দাবি জানাতে পারতেন, কিন্তু সে কাজ কোনওদিন করেননি। অল্প টাকায় ছবি করাটা বাবার কাছে স্বাভাবিক ছিল। আবার কখনও বলেননি, ‘দ্যাখো, আমি কত অল্প টাকায় ছবি করতে পারি’। খুবই সাদাসিধে জীবন ছিল তাঁর। এবং বরাবর সেটাই চাইতেন তিনি।’’
‘জন অরণ্য’ ছবিতে কাজ করতে এসে ‘প্রদীপ মুখোপাধ্যায়’ গল্প শুনেছিলেন, একটা সময় বাজারে সত্যজিতের এত দেনা হয়ে গিয়েছিল যে, তাঁর নিজের মাইনের অর্ধেকটাই চলে যেত সেই দেনা শোধ করতে। সত্যজিতের ‘প্রোডাকশন কন্ট্রোলার’ ‘অনিল চৌধুরী’ বলতেন, ‘প্রোডাকশনের বোঝা’ বয়ে-বয়ে সত্যজিৎ রায়ের কাঁধটা বেঁকে গিয়েছে। ‘প্রদীপ মুখোপাধ্যায়’ লক্ষ্য করেছিলেন, ‘‘মানুষটা কী অসম্ভব পাংচুয়াল। ঠিক সময় সেটে আসতেন। লক্ষ্য রাখতেন কে কখন আসছে। সময় যাতে নষ্ট না হয়, সেটা দেখতেন। র স্টকের (ফিল্ম) খুব দাম বলে প্রয়োজনের বেশি একটা শটও নিতেন না। অন্য পরিচালকদের দেখেছি, ওঁর থেকে কত আরামে কাজ করছেন। মানিকদা আমাদের কখনও বুঝতে দিতেন না, কত রকম সমস্যা পার হতে হতে এঁকে ছবিটা করতে হচ্ছে।’’ সত্যজিৎ রায়ের ‘চিত্রগ্রাহক’ ‘সৌমেন্দু রায়’ তাঁর স্মৃতিচারণে জানিয়েছিলেন, ‘‘ওঁর ছবি তৈরির পদ্ধতির মধ্যেই থাকত নতুনত্ব। ‘নায়ক’-এর মতো ছবিতেও উত্তমকুমারকে উনি মেকআপ ব্যবহার করতে দেননি। এই নিয়ে উত্তমকুমারের মনে বেশ খুঁতখুঁতানি ছিল। কারণ, তার কিছুদিন আগেই ওঁর চিকেন পক্স হয়েছিল। মুখে হালকা দাগ ছিল। আরও কত কী বলা যায় ওঁর কাজের পদ্ধতি নিয়ে। বংশী চন্দ্রগুপ্তর প্লাস্টারে ছাঁচ নিয়ে সেট বানানো, সুব্রত মিত্রর শ্যাডোলেস আলোর ব্যবহার, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা' ছবিতে কালার ফিল্ম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সুব্রতদার বিস্ময়কর উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানো ইত্যাদি আজ মিথের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে।’’ আরও একটা ব্যাপার নিয়ে সত্যজিৎ রায় ভেবেছিলেন গভীর ভাবে। তাঁর ‘আন্তর্জাতিক খ্যাতি’ দর্শকদের চাহিদাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে যুগের প্রগতিবাদী, উদার মানসিকতার পরিবেশের সামনে সত্যজিৎকে বারবার দাঁড়াতে হয়েছিল নিজের ছবি নিয়ে। দর্শকের কাছে তাঁর ছবির চাহিদা যেহেতু ছিল অন্য রকম, তাই তিনি কী ছবি করছেন, কী করবেন, কেন করবেন প্রভৃতি নানা প্রশ্ন উঠে আসত অনিবার্য ভাবে। সেই দর্শকদের তিনি নিজেই তৈরি করে নিয়েছিলেন ছবি তৈরির পাশাপাশি। তাঁর লেখা ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ বা ‘আওয়ার ফিল্মস দেয়ার ফিল্মস’ শুধুমাত্র সিনেমার উপর লেখা কোন সাধারণ বই নয়। সেই লেখার মধ্যে দিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজের ছবির দর্শককে। সিনেমা কী এবং কেন সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই বাংলার দর্শককে। তবেই তারা তাঁর ছবির ভাষাকে বুঝতে পেরেছেন। ‘ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের’ সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ঘটেছিল সিনেমা তৈরির আগে থেকে। ‘ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের’ কথায়, ‘‘একটা সমালোচনা হচ্ছিল যে, উনি ষাট-সত্তরের দশকের উত্তাল সময়টাকে তাঁর ছবিতে ধরছেন না, মোকাবিলা করছেন না। ওই সমালোচনার উত্তরই হচ্ছে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘জনঅরণ্য’-র মতো ছবি।’’ আজকের চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে তাঁদের সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতা কতখানি তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। অনেকেই হয়তো যুক্তি দেবেন, ওই ধরনের ছবি করতে টাকা দেবেন না কোনও প্রযোজক। ‘সন্দীপ রায়’ জানিয়েছেন, ‘‘সত্যজিৎ রায়কেও সেই সমস্যা পার হতে হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে তাঁকে উজান বাইতে হয়েছে। প্রথম ছবি থেকে শুরু করে শেষ ছবি ‘আগন্তুক’, উজানে বেয়ে চলা এক চলচ্চিত্রকারের ইতিবৃত্ত।’’ সত্যজিৎ নিজের পথ কেটেছিলেন বিরুদ্ধতার মধ্যে বসে। বিজ্ঞাপনের জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তিনি জানতেন, ছবির দর্শককে কীভাবে ‘হলমুখী’ করতে হবে। ‘অনিল চৌধুরী’র স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ‘‘... ‘পথের পাঁচালী’ রিলিজের সময় কলকাতার রাস্তায় নিজের খরচে বড় বড় হোর্ডিং লাগানোর ব্যবস্থা করেছিলেন সত্যজিৎবাবু। যা দেখে সবাই বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল।’’ এইভাবেই পথ হেঁটেছিলেন সত্যজিৎ। তাঁকে নিয়ে ‘শ্যাম বেনেগালের’ করা ‘তথ্যচিত্র’টি যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা হয়তো খেয়াল করেছেন, নিজের ছবির কথা বলতে-বলতে সত্যজিৎ হঠাৎ এক জায়গায় কিছুটা ‘অভিমানী গলায়’ বলে উঠেছিলেন, ‘‘ইট ওয়াজ নেভার ভেরি ইজি ফর মি।’’ কথাটা কানে লাগতে বাধ্য। যে মানুষ সারা জীবন ধরে একটার পর একটা ‘কালজয়ী চলচ্চিত্রের’ জন্ম দিয়েছিলেন, সেই মানুষটিকেই ছবির অর্থ জোগাড়ের ব্যবস্থা করতে বা অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে কষ্ট করতে হয়েছিল? এতবড় মাপের একজন শিল্পীকে সাহায্য করতে ‘তৎকালীন বাঙালি সমাজ’ এগিয়ে আসেনি, একথা অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। উল্টে তাঁকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন অনেকেই। ‘আন্তর্জাতিক স্তরে’ তাঁর লেখা ‘চিত্রনাট্যের ভাবনা’ও চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু নিজের ছবির প্রতি বিশ্বাসের জোরে সত্যজিৎ সেইসব বাধা এক-এক করে পার হয়ে তবেই জীবনের শেষ দিকে রোগশয্যায় শুয়ে ‘অস্কার’ হাতে ধরে তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠতে পেরেছিলেন, ‘‘দেয়ার ইউ আর’’।
সত্যজিতের সারা জীবন পর্যালোচনা করতে বসলে মনে হতেই পারে তা যেন নিঁখুত একটা চিত্রনাট্যের মতো সাজানো। তাঁর মতো শিল্পীর দেখা ‘রেনেসাঁসের যুগে’ই মেলে। মনে হয়, ভুল করে তিনি পোড়া এক সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন। তাই সেইসময় তাঁকেও ছেড়ে কথা বলেনি। তিনি যেমন নতুন ধরনের ক্যামেরা ‘অ্যারিফ্লেক্স’ আনিয়ে বাংলা তথা ভারতের সিনেমা করিয়েদের ‘আউটডোর শ্যুটিংয়ের ভাবনা’কে বদলে দিয়েছিলেন, তেমনি ছবি তৈরির অন্যান্য বিভাগ যেমন ‘শিল্প নির্দেশনা’, ‘সম্পাদনা’, ‘ক্যামেরার কাজ’, ‘পোশাক’, ‘মেক-আপ’ ইত্যাদি কাজে তাঁর সতীর্থ ‘সুব্রত মিত্র’, ‘বংশী চন্দ্রগুপ্ত’, ‘দুলাল দত্ত’দের সঙ্গে নিয়ে কলকাতার চলচ্চিত্র জগতে আজকের বহুল প্রচারিত ‘ইন্ডি’ সিনেমার ভাবনাকে প্রথম প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু তাই বলে ‘বলিউড’ বা ‘কলকাতার টালিগঞ্জ পাড়া’র ‘রাজনীতির দুর্বিপাক’ থেকে সত্যজিৎ রায় নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি। এই রাজনীতি আজ যেমন করে, সেদিনও তেমনই বাংলার অনেক নামী চলচ্চিত্রকারদের ছবি করার পথে বাধার সৃষ্টি করেছিল। একবার সত্যজিতের ছবির মুক্তি আটকাতে ‘টালিগঞ্জের শিল্পী কলাকুশলীদের একাংশ’ পথে নেমেছিলেন। আবার ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’র মুক্তি আটকাতে ‘মুম্বাইয়ের প্রদর্শকরা’ তাঁকে ‘সিনেমা হল’ দিতে অস্বীকার করেছিলেন। ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল ছবির সমস্ত ‘হোর্ডিং ও ব্যানার’। সময়টা ছিল ১৯৬৯ সাল। পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে একটা ‘সংরক্ষণ সমিতি’ তৈরি করা হয়েছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল, ‘বাংলা সিনেমা শিল্পের পুনরুজ্জীবন’। ‘প্রদর্শক’ ছাড়াও সিনেমা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য প্রতিনিধিদের সেই সমিতিতে রাখা হয়েছিল। কিন্তু মাস আটেক যেতে না যেতেই পরিচালক, কলাকুশলীরা মনে করতে শুরু করেছিলেন যে সেই সমিতি তাঁদের কাজের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ‘কাননদেবী’, ‘সত্যজিৎ রায়’, ‘তপন সিংহ’, ‘তরুণ মজুমদার’, ‘হেমেন গঙ্গোপাধ্যায়’সহ বেশ কিছু বিশিষ্ট মানুষ সেই সমিতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এর ফলে এক বিরোধিতার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ‘তপন সিংহ’ তাঁর ‘সাগিনা মাহাতো’ ছবির কাজ শুরু করতে গিয়ে অসুবিধেয় পড়েছিলেন। ‘তরুণ মজুমদারের’ মনে হয়েছিল, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ছবি করা অসম্ভব।’’ সত্যজিৎ রায় সমিতির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন। ওদিকে সমিতি তাঁর বিরুদ্ধে ‘অসহযোগিতার অভিযোগ’ এনেছিল। শেষে এক ‘সাংবাদিক সম্মেলন’ করে ‘সত্যজিৎ রায়’, ‘তপন সিংহ’, ‘তরুণ মজুমদার’রা ঘোষণা করেছিলেন যে কেন তাঁরা সমিতির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছেন। এর পর অবস্থা ক্রমশঃ ঘোরালো হয়ে উঠতে শুরু হয়েছিল, যার কোপ গিয়ে পড়েছিল মুক্তির অপেক্ষায় থাকা এইসব দলছুট পরিচালকের ছবির উপরে। যার মধ্যে ছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিটি। দীর্ঘ সাতমাস ধরে ‘কলকাতা’, ‘বোলপুর’, ‘সিমলা’, ‘জয়সালমীরে’ শ্যুটিং এবং ছবি শেষ হওয়ার পরে একই সঙ্গে কলকাতায় মুক্তি ও ‘বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে’ ছবিটি পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেইসময় ‘সংরক্ষণ সমিতি’র সঙ্গে তাঁর বিরোধের কারণে ‘টালিগঞ্জের’ তৎকালীন নেতারা ‘গুগাবাবা’-র মুক্তি আটকে দিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। এই নিয়ে নানা মহলে আলোচনা শুরু হয়েছিল এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় চিঠিপত্র প্রকাশিত হয়েছিল নানা মতামত জানিয়ে। ‘মিনার’, ‘বিজলী’, ‘ছবিঘর’-এ মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ‘গুপী গাইনের’। সেই মতো চুক্তিও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ‘সংরক্ষণ সমিতি’ চাপ দিয়ে ‘প্রেক্ষাগৃহ কর্তৃপক্ষ’র সঙ্গে নতুন একটি চুক্তি করে স্থির করেছিল ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর বদলে ‘আরোগ্য নিকেতন’ ছবিটি মুক্তি পাবে। মিটিং, মিছিলে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ‘টালিগঞ্জ পাড়া’। ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর পক্ষে শেষ পর্যন্ত টালিগঞ্জের শিল্পী, কলাকুশলীদের একটা অংশ পথে নেমেছিলেন। যাঁদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বয়ং ‘মহানায়ক উত্তমকুমার’। ২৫শে এপ্রিল, ১৯৬৯ সালে সেই মিছিল ‘টালিগঞ্জ’ থেকে এসে পৌঁছেছিল ‘রাইটার্স বিল্ডিংসে’। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন ‘উপ-মুখ্যমন্ত্রী’ ‘জ্যোতি বসু’র হাতে ‘স্মারকলিপি’ জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে এত করেও অবশ্য সত্যজিতের ছবির মুক্তিকে আটকানো যায়নি। শুধু তাই নয়, টানা ‘১০২ সপ্তাহ’ চলে সেই ছবি ‘বক্স অফিসে’ ইতিহাস তৈরি করেছিল। আজ পর্যন্ত সেই রেকর্ড ভাঙতে পারেনি অন্য কোনও ছবি। ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’ ছিল হিন্দি ছবি। তাই সেটির মুক্তি আটকানোর পিছনে ছিল ‘প্রাদেশিকতার গন্ধ’। ‘সৌমেন্দু রায়’ জানিয়েছিলেন, ‘‘সত্যজিৎ রায়ের মতো চলচ্চিত্রকার হিন্দি সিনেমায় পা রাখছেন, ব্যাপারটা তখন অনেকেই ভাল চোখে নেননি। কিন্তু প্রদর্শনী নিয়ে বিরোধিতার কারণে ঠিক যেভাবে সারা ভারতে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা করা যায়নি।’’ অনেকেই আজ আর সেইসব পুরনো দুঃখ নিয়ে কথা বলতে চান না। যাঁরা বলতে পারতেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ আর নেই। তবু ইতিহাস থেকেই যায়।
(তথ্যসূত্র:
১- সত্যজিৎ: জীবন আর শিল্প, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত, প্রতিভাস।
২- ২- অনন্য সত্যজিৎ, প্রবোধকুমার মৈত্র সম্পাদিত।
৩- সত্যজিৎ স্মরণে, আনন্দলোক পত্রিকা, ২৭শে এপ্রিল ২০১৫ সাল।)

Tuesday, April 20, 2021

‘সুভাষচন্দ্রের মা জননী’

(তথ্যসূত্র:
১- অসমাপ্ত আত্মজীবনী, সুভাষচন্দ্র বসু।
২- শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু সমগ্র রচনাবলী।
৩- ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে সুখী গৃহকোণ পত্রিকায় প্রকাশিত শ্রীমতী কৃষ্ণা বসু লিখিত প্রবন্ধ।)


‘সুভাষচন্দ্রের মা জননী’

বহু বছর আগে ‘চেকোস্লোভাকিয়া’র (এখন চেক রিপাবলিক’) ‘প্রাগ’ শহরের ‘ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটে’ নেতাজির জীবন ও কর্মের ওপরে এক ‘কনফারেন্সে’ একটি ‘পেপার’ পড়েছিলেন, ‘নেতাজির ভাইপো’ ‘শিশু চিকিৎসক’ ‘শিশির কুমার বসুর সহধর্মিনী’ ‘শ্রীমতী কৃষ্ণা বসু’। বিষয় ছিল, ‘নেতাজির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ নারী’। সেই ‘পেপারে’ তিনি যাঁদের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তাঁরা হলেন - নেতাজির নিজের মা ‘প্রভাবতী দেবী’, নেতাজির ‘রাজনৈতিক জীবনের গুরু’ ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের স্ত্রী’ ‘বাসন্তী দেবী’ - যাঁকে সুভাষচন্দ্র ‘মা’ বলে ডাকতেন এবং নেতাজির ‘মেজদাদা’ ‘শরৎচন্দ্র বসুর স্ত্রী’ ‘মেজবউদি’ ‘বিভাবতী দেবী’, তিনিও নেতাজির কাছে ‘মাতৃসমা’ ছিলেন। সেই ‘আন্তর্জাতিক সেমিনারে’ প্রশ্নোত্তরের সময়ে ‘ইউরোপীয় ইতিহাসবিদরা’ বিস্ময়ের সঙ্গে ‘শ্রীমতী কৃষ্ণা বসু’কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘‘সকলেই মা? নিজের মা, গুরুপত্নী বাসন্তী দেবী আবার সিসটার-ইন-ল মেজবউদি? নেতাজির কি কোনওরকম মাদার ফিকসেশন ছিল?’’ ‘শ্রীমতী কৃষ্ণা বসু’র উত্তর তাঁর নিজের ভাষ্যেই জানা যাক। ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে, সুখী গৃহকোণ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘আমার গুরুত্বপূর্ণ নারীর তালিকায় আমি অবশ্যই সুভাষ পত্নী এমিলিয়েকে যুক্ত করেছিলাম। ডেনমার্কের মহিলা ইতিহাসবিদ জিজ্ঞাসা করে বসলেন, ‘এমিলিয়েও কি এক ধরনের ‘সারোগেট’ মাদার?’ কী মুশকিল! সমবেত বিদেশি বিদ্বজ্জনকে আমি বুঝিয়ে বললাম আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে আমরা ঈশ্বরকেও মাতৃরূপে কল্পনা করেছি, শক্তিরূপিনী মা। আবার স্বদেশও আমাদের মাতা। আমাদের চিন্তায়, দর্শনে মাতৃভাবনার আছে আলাদা গুরুত্ব। সেই ভাবনার প্রভাব সুভাষচন্দ্রের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।’’
একবারে ‘সুভাষচন্দ্র বসু’র ‘মা জননী’ ‘প্রভাবতী দেবী’র প্রসঙ্গে আসা যাক। তাঁর নিজের ছেলে-মেয়েরা এমনকী তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম সকলেই তাঁকে ‘মা জননী’ বলেই ডাকতেন। তিনি ছিলেন নেতাজির ‘গর্ভধারিণী মা’, কিন্তু ‘বাসন্তী দেবী’কে ‘প্রভাবতী দেবী’ বলেছিলেন - ‘‘আপনিই মা, আমি তো ধাত্রী।’’ এটা একজন মায়ের কত উদার মনের পরিচয় হতে পারে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আজও ‘নেতাজি ভবনের সংগ্রহশালা’য় সাজানো আছে নেতাজির পিতা ‘জানকীনাথ বসু’র ডায়েরির পাতা। নিজের ডাইরিতে ২৩শে জানুয়ারি, ১৮৯৭ সালে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘আজ দ্বিপ্রহরে প্রভার একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছে।’’ এই পুত্র যেমন মায়ের ‘গর্বের কারণ’ হয়েছিলেন তেমনই ছেলের জন্য মা’কে সারাজীবন কত যে দুশ্চিন্তা বহন করতে হয়েছিল তারও কোনও ঠিক নেই। বালক সুভাষ পড়াশোনাতে ভালো ছিলেন, ‘কটকের’ ভালো স্কুলে পড়তেন, পরীক্ষায় ভালো ফলও করতেন। ‘মা জননী’র মনে কিন্তু তখন থেকেই চিন্তা বাসা বেঁধেছিল। কারণ পড়াশোনার চাইতে ‘সমাজসেবার কাজে’ তাঁর ছেলের বেশি আগ্রহ ছিল। সুভাষ বাড়িতে লুকিয়ে, স্কুল পালিয়ে এলাকার দুর্গত মানুষের সেবাতে সময় বেশি দিতেন। আর নিতান্ত অল্প বয়স থেকে তাঁর মনের মধ্যে ছিল ‘স্বদেশ সেবা’। ‘মা জননী’ যখন কোনও কাজে কয়েকদিনের জন্য বাইরে যেতেন, তখন সুভাষ নিজের মা’কে দীর্ঘ পত্র লিখতেন। অল্পবয়সি স্কুলের ছাত্রের পক্ষে সেইসব পত্রে থাকত ‘গুরুগম্ভীর দার্শনিক কথাবার্তা’। সুভাষ লিখতেন, ‘‘মা ভারতবর্ষ ভগবানের বড় আদরের স্থান।’’ সুভাষ আরও লিখতেন, ‘‘মা আপনি কি শুধু আমার মা, আপনি সকল ভারতবাসীর মা। ভারতবাসীর দুঃখ দুর্দশায় আপনার মন কি কাঁদে না?’’ কোনও চিঠিতে আবার তিনি নিজের মা’কে প্রশ্ন করতেন, ‘‘আমি বড় হয়ে জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হলে আপনি কি খুশি হবেন নাকি প্রকৃত মানুষ হলে আপনার বেশি আনন্দ হবে!’’ পুত্রের সেইসব ‘গভীর দার্শনিক চিঠিপত্র’ পেয়ে যে তাঁর মায়ের মনোভাব কী হত কে জানে।
সুভাষচন্দ্র তাঁর ‘আত্মজীবনী’তে লিখেছিলেন, ‘‘মা জননী ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহিলা। তিনি ছিলেন সংসারের সর্বময় কর্ত্রী। আটটি ছেলে ও ছয়টি মেয়ে নিয়ে বিরাট সংসার তিনি কঠোর হাতে পরিচালনা করতেন। ছেলেরা ঠিকমতো পড়াশোনা করছে কি না সেদিকে ছিল তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বাড়িতে পড়া তৈরি করার সময় মা জননী মাঝে মাঝেই ঘুরে যেতেন। ছেলেরা হয়তো দুষ্টুমি করছে, এমন সময়ে মা আসছেন বুঝতে পারলেই তাঁরা ইংরাজি বই খুলে উচ্চস্বরে পড়তে শুরু করতেন। মা জননী ইংরাজি জানেন না যদিও ইংরাজি শেখার খুব শখ ছিল। বারকয়েক আসা-যাওয়া করার পর উনি বললেন, ‘যখনই আসি তোমরা একই জিনিস পড়ছ কেন?’ ছেলেরা ধরা পড়ে গেছে, একটা পাতা খুলেই বার বার পড়ছিল।’’ পড়াশোনার ক্ষতি করে ‘সমাজসেবা’ করলেও সুভাষ ‘ম্যাট্রিক পরীক্ষা’য় খুব ভালো ফল করেছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রদের মধ্যে ‘দ্বিতীয় স্থান’ লাভ করেছিলেন। এরপরে ‘কলকাতার এলগিন রোডের বাড়ি’ থেকে ‘প্রেসিডেন্সি কলেজে’ তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়েছিল। ছেলেকে নিয়ে মায়ের চিন্তার কোনও শেষ ছিল না। একবার তো বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে সুভাষ তাঁর বন্ধু ‘হেমন্ত সরকারের’ সঙ্গে গুরুর সন্ধানে ‘গৃহত্যাগ’ করেছিলেন। বেশ কিছুদিন তাঁর কোনও খবর পাওয়া যায়নি। সুভাষচন্দ্র তাঁর ‘আত্মজীবনী’তে জানিয়েছিলেন, সেবার যখন তিনি গৃহে ফিরেছিলেন তাঁর পিতা ‘জানকীনাথ’ তাঁকে শান্তভাবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ‘মা জননী’ অস্থিরভাবে কেঁদেছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘‘আমার মৃত্যুর জন্যই তোমার জন্ম, আর একটু হলে আমি প্রাণত্যাগ করতাম।’’ ‘প্রেসিডেন্সি কলেজে’ ‘অধ্যাপক ওটেনের’ ঘটনার পরে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র। এতে তাঁর পড়াশোনাতে ছেদ পড়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে ‘বিলেতে’ ‘আইসিএস’ পড়তে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন তাঁর পিতা। কিন্তু পরীক্ষায় পাশ করার পরে সুভাষচন্দ্র জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি ‘ব্রিটিশ সরকারের চাকরি’ করবেন না, ‘দেশের কাজে’ নিজেকে উৎসর্গ করবেন। সেকালে ‘আইসিএস’ হওয়া খুব বড় প্রাপ্তি মনে করা হত। সুভাষের ‘আইসিএস’ ত্যাগের সিদ্ধান্তে তাঁর ‘মেজদাদা’ ‘শরৎচন্দ্র বসু’ ছাড়া পরিবারের সকলেই বিচলিত বোধ করেছিলেন। ছেলে যে একটু অন্যরকম সেকথা অবশ্য তাঁর মায়ের অজানা ছিল না। ‘রাজনৈতিক জীবনে’ বার বার কারাগারে বন্দি হওয়া, তারপর তিনের দশকে ‘ইউরোপে’ ‘দীর্ঘ নির্বাসন’, সবই তাঁর ‘মা জননী’কে সহ্য করতে হয়েছিল।
সেকালে ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি’কে বলা হত ‘রাষ্ট্রপতি’। সেই পদ ছিল দেশের সব চাইতে ‘সম্মানীয় পদ’। সুভাষচন্দ্র যেদিন ‘রাষ্ট্রপতি পদে’ নির্বাচিত হয়েছিলেন সেদিন ‘মা জননী’ ছিলেন পুত্রগর্বে গর্বিত মাতা। কিন্তু এক অসাধারণ পুত্রের জননীর নিশ্চিন্তে জীবনযাপন ছিল অসম্ভব। এরপরে ‘এলগিন রোডের বাড়ি’ থেকে ১৯৪১ সালের ১৬-১৭ই জানুয়ারি রাত্রে ব্রিটিশ শাসকের চোখে ধুলো দিয়ে সুভাষচন্দ্রের ‘মহানিষ্ক্রমণ’ ঘটেছিল। সেই ‘গৃহত্যাগ’ তাঁকে তাঁর মায়ের কাছেও গোপন করতে হয়েছিল। পাশের শয়নকক্ষে নিদ্রিত মা’কে ছেড়ে যখন তিনি যখন চলে গিয়েছিলেন, তখন না জানি তাঁর মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল। সুভাষের ‘গৃহত্যাগের খবর’ প্রকাশ্যে আসার পরে পুলিশ বাড়ি সার্চ করেছিল। ‘পুলিশ কমিশনার’ রিপোর্ট দিয়েছিলেন যে সুভাষের ‘মায়ের উদ্বেগ’ কিন্তু ‘খুব বিশ্বাসযোগ্য’। তিনি পুলিশের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘‘তোমরা আমার ছেলেকে কী করেছ বল!’’ নেতাজি সুভাষচন্দ্র দেশের বাইরে প্রথমে ‘জার্মানি’তে তারপর ‘পূর্ব এশিয়া’তে ভারতের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন, ওদিকে কলকাতার বাড়িতে চলেছিল তাঁর বিধবা মায়ের ‘একাকী জীবন’। নিশ্চয় তাঁরা পরস্পরের জন্য চিন্তিত থাকতেন। সুভাষচন্দ্র ‘পিতৃহারা’ হয়েছিলেন ১৯৩৪ সালে। তখন তিনি ‘এমিলিয়ে’কে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‘স্বামীর মৃত্যু ভারতীয় রমণীকে একেবারে নিঃস্ব করে দেয়। মা ভেঙে পড়েছেন, আমরা ছেলে মেয়েরা সামলে রেখেছি।’’ ‘সিঙ্গাপুরের বাড়ি’তে বসে একাকিনী মায়ের কথা তাঁর নিশ্চয় মনে পড়ত।
যুদ্ধের মধ্যে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজের’ বেশ কয়েকজন সেনা যাঁরা ‘গুপ্তচরবৃত্তি’তে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, ‘সাবমেরিনে’ করে গোপনে ভারতের উপকূলে এসে পদার্পন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন কলকাতায় এসে ‘শিশিরকুমার বসু’র সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ‘শিশির বসু’ এবং ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ারের’ বিপ্লবী কর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হওয়ার পরে কলকাতা থেকে ‘পূর্ব এশিয়া’তে নেতাজির সঙ্গে ‘বাংলার বিপ্লবীদের’ ‘রেডিও যোগাযোগ’ স্থাপিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্য এই যে এর মাধ্যমে প্রথম যে খবরটি নেতাজির কাছে পৌঁছেছিল তা ছিল, তাঁর ‘মা জননী’ ‘প্রভাবতী দেবীর মৃত্যু সংবাদ’। ‘আজাদ হিন্দ ফৌজের’ ‘দেবনাথ দাস’ পরে ‘শ্রীমতী কৃষ্ণা বসু’কে জানিয়েছিলেন, ‘রেঙ্গুনে’ নেতাজির অফিস ঘরে ঢুকে একদিন তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে নেতাজি কেমন যেন শুকনো মুখে বসে আছেন। ‘‘আপনার শরীর খারাপ?’’ - ‘দেবনাথ দাসের’ ইউ প্রশ্নের উত্তরে একটু চুপ করে থেকে নেতাজি তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘এইমাত্র খবর পেলাম আমার মা আর নেই।’’ বিদেশে বসে যুদ্ধের মধ্যে এভাবেই তিনি ‘মাতৃবিয়োগের খবর’ পেয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালের ২৯শে ডিসেম্বর ৭৪ বছর বয়সে, কলকাতায় সুভাষচন্দ্রর ‘মা জননী’ ‘প্রভাবতী বসু’র জীবনাবসান হয়েছিল। সুভাষচন্দ্রের অপর দুই ‘মাতৃসমা ‘দেশবন্ধুপত্নী বাসন্তী দেবী’ এবং ‘মেজবউদি বিভাবতী দেবী’ স্বাধীন ভারতে বেশ কিছুকাল জীবিত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গেও ‘পুত্রসম’ সুভাষের আর দেখা হয়নি। ‘মা জননী প্রভাবতী দেবী’ এবং অপর দুই ‘মাতৃসমা’ নারী, তিনজনেই অন্তরে জানতেন যে সুভাষ জন্ম থেকে ‘দেশের সেবায় বলিপ্রদত্ত’। ‘মাতৃস্নেহপাশে’ তাঁকে বেঁধে রাখা যাবে না। ‘স্বদেশ সেবায়’ পুত্রকে উৎসর্গ করে তাঁরা ছিলেন ‘গর্বিত মা’।
(তথ্যসূত্র:
১- অসমাপ্ত আত্মজীবনী, সুভাষচন্দ্র বসু।
২- শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু সমগ্র রচনাবলী।
৩- ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে সুখী গৃহকোণ পত্রিকায় প্রকাশিত শ্রীমতী কৃষ্ণা বসু লিখিত প্রবন্ধ।)