Pages

Monday, April 19, 2021

বৌদ্ধধর্মে মূর্তিপূজার ইতিবৃত্ত

বৌদ্ধধর্মে মূর্তিপূজার ইতিবৃত্ত’



বৌদ্ধ মূর্তিশাস্ত্রের ভিত্তি বস্তুতঃ একটি তন্ত্রগ্রন্থের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেই গ্রন্থের নাম ‘সাধনমালা’। ‘সাধনমালা’র যতগুলি পুঁথি এখনও পর্যন্ত পাওয়া গেছে সেগুলোর মধ্যে একটা পুঁথি সবচেয়ে প্রাচীন। এই পুঁথিটি ‘কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিশালা’য় রক্ষিত আছে। পুঁথিটির একটা পাতায় ‘নেবারি সংবতে’ ‘গ্রন্থসংগ্রহের তারিখ’ দেওয়া আছে। সেই তারিখটি হল ‘২৮৫ নেবারি সংবৎ’, অর্থাৎ ১১৬৫ খ্রীস্টাব্দ। ‘সাধনমালা’য় ‘৩১২টি সাধনা’য় অগণিত ‘দেবদেবীর বর্ণনা’, ‘মূর্তির ধ্যান’ এবং ‘পূজাপদ্ধতি’, ‘মন্ত্র ও মন্ত্রপ্রয়োগাদি’ দেওয়া আছে। সেই বইটি ‘বরোদা’র ‘গায়কোয়াড় ওরিয়েন্টাল সিরিজে’ দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমানে সেই বইটি দুষ্প্রাপ্য। এছাড়া, এই বিষয়ে আরও একটা বিশেষ দামি পুঁথি হল ‘নিষ্পন্নযোগাবলী’। সেই বইটি লিখেছিলেন একজন প্রাচীন বাঙালি পণ্ডিত। তাঁর নাম ছিল ‘মহাপণ্ডিত অভয়াকর গুপ্ত’। তিনি ‘বিক্রমশীলা মহাবিহারে’ গবেষণার কাজ করতেন এবং বিস্তর গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁর সময় ছিল ১১৩০ খ্রীষ্টাব্দের কাছাকাছি। ‘নিষ্পন্নযোগাবলী’তে প্রায় ছয়’শো দেবদেবীর বিবরণ দেওয়া আছে, এবং সেগুলোর প্রত্যেকটি ‘মূর্তিকল্পনা’ মূর্তিবিদদের কাছে মহামূল্যবান। ‘পাথরের মূর্তি’, ‘ধাতুমূর্তি’ ও ‘ছবিতে আঁকা মূর্তি’ প্রায় সব জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়। ভারতের যে যে জায়গায় ‘বৌদ্ধ তান্ত্রিক ধর্মের প্রভাব’ বিস্তৃত হয়েছিল, কিংবা যে যে জায়গায় ‘বৌদ্ধপন্থী রাজাদের রাজত্ব’ ছিল সেই সব জায়গা থেকেই বৌদ্ধমূর্তি পাওয়া গেছে। বহু জায়গায় প্রাচীন ভগ্নাবশেষ খুঁড়ে বের করার সময়ও প্রচুর বৌদ্ধমূর্তি পাওয়া গেছে। ‘সারনাথ’, ‘ওদন্তপুরী বিহার’, ‘বিক্রমশীলা বিহার’, ‘কুক্কুটপাদগিরি’, ‘নালন্দা’, ‘বুদ্ধগয়া’, ‘পাহাড়পুর’, ‘মহোৎসবপুর’ বা ‘মহোবা’, ‘কুশীনগর’, ‘শ্রাবস্তী’ ইত্যাদি বহু জায়গায় খননকার্য করবার সময় অগণিত মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। তাছাড়া, রাস্তায়-ঘাটে-দেওয়ালে-মন্দিরে যে কত বৌদ্ধমূর্তি পাওয়া যায় তার ইয়ত্তা নেই। ‘বাংলায়’, ‘বিহারে’, ‘আসামে’, ‘উড়িষ্যায়’, এবং ‘উত্তরপ্রদেশে’ এই ধরনের বহু মূর্তি পাওয়া গেছে। সেই মূর্তিগুলো ‘মূর্তি-শাস্ত্রবিদ’দের এবং ভারতবাসীদের কাছে বহুমূল্য সম্পদ। অনেক মূর্তি যেমন চোরাপথে বিদেশে পাচার হয়ে গিয়েছে, ঠিক তেমনই আবার অনেক মূর্তি সযত্নে সরকারি জাদুঘরগুলিতে রক্ষিত হয়েছে। সরকারি জাদুঘরগুলির মধ্যে ‘কলকাতা’, ‘পাটনা’, ‘লক্ষ্ণৌ’, ‘সারনাথ’, ‘নালন্দা’ ও ‘ঢাকা’র জাদুঘরই উল্লেখযোগ্য। সেখানে নানাপ্রকারের বিচিত্র বৌদ্ধমূর্তি সংরক্ষিত রয়েছে। অধুনা বাংলাদেশের ‘রাজশাহির খিচিঙ’ ও ‘ময়ূরভঞ্জের’ জাদুঘরগুলিতেও কিছু কিছু বৌদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ও বিভিন্ন প্রকারের ‘দেবতামূর্তি’, ‘চিত্র’, ‘প্রস্তর ও ধাতুমূর্তি’ এবং ‘বৌদ্ধ সাহিত্য’, ‘দর্শন’ ও ‘তন্ত্রের সংগ্রহ’ কেবল ‘নেপালেই’ দেখতে পাওয়া যায়। বলাবাহুল্য, ‘নেপালে’ এখনও বৌদ্ধধর্ম জীবিত অবস্থায় বর্তমান। সেইজন্য সেখানে ‘মহাযানী’ ও ‘বজ্রযানী’ বৌদ্ধদের সংখ্যা অনেক বেশি। তাঁরা এখনও ‘শাস্ত্রোক্ত রীতি’তে পূজা পাঠ ইত্যাদি করেন এবং প্রত্যেকের ঘরেই কিছু-না-কিছু দেবপ্রতিমা পূজার জন্য রক্ষিত থাকে। ‘কাঠমাণ্ডু’তে এবং তার কাছাকাছি ‘ললিতপত্তন’ শহরে শত শত ‘বৌদ্ধ মঠ ও বিহার’ আছে। সেইসব বিহার এক-একটা জাদুঘরবিশেষ। কোনো কোনো বিহারে পাঁচশোর কাছাকাছি বা তারও বেশি ‘পাথরের ও ধাতুর মূর্তি’ দেখতে পাওয়া যায়। মূর্তিবিদদের সেই সব বিহার স্বর্গের আনন্দ দিয়ে থাকে। যেসব মূর্তি কোথাও পাওয়া যায় না, যেসব দেবতা কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না, সেইসব ‘মূর্তি ও দেবতা’ ‘নেপালের বিহারগুলি’তে পাওয়া যায়। ‘তিব্বত’, ‘চিন’ ও ‘মাঞ্জুরিয়া’তে ‘বজ্রযান’ বৌদ্ধধর্ম প্রবেশলাভ করেছিল। সেইসব দেশের ‘বজ্রযানী’ বৌদ্ধেরা ‘মূর্তিপূজক’ হিসাবে ভারতীয়দের শিষ্য ছিলেন, এই কথা বললে অত্যুক্তি করা হবে না। ‘মাঞ্চুরিয়া’র ‘পিকিং’ শহরে রাজপ্রাসাদ-সংলগ্ন কয়েকটি মন্দির আছে। সেই মন্দিরে প্রায় দুই সহস্র বৌদ্ধ দেবতার ‘ধাতুমূর্তি’ পাওয়া গিয়েছিল। সেই মূর্তিগুলির নীচে ‘চিন ও তিব্বতি ভাষায়’ তাদের নাম খোদাই করা আছে। সেই মূর্তিগুলির ছবি তুলে সেগুলো ‘আমেরিকার হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক’ ‘ওয়াল্টার ইউজিন ক্লার্ক’-এর কাছে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। তিনি সেগুলো নিয়ে গবেষণা করে মূর্তিগুলির উপরে একটা বই লিখেছিলেন। বইটির নাম ‘Two Lamaistic Pantheons’, অতীতে সেই বইটি দুইখণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। মূর্তিশাস্ত্রের গবেষকদের কাছে সেই বই একটি অমূল্য সম্পদ। দেখা গিয়েছিল যে, ‘পিকিঙের’ সেই মূর্তিগুলি সম্পূর্ণ ‘ভারতীয় ছাঁচে’ তৈরি করা হয়েছিল এবং ‘নিষ্পন্নযোগাবলী’তে প্রদত্ত ধ্যান অনুসারেই শিল্পীরা বেশির ভাগ মূর্তি বানিয়েছিলেন। এছাড়াও ‘তিব্বতে’ বহু বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি পাওয়া যায়, তাদের ভিতরে কিছু কিছু মূর্তি ভারতবর্ষে লোপ পাওয়া সত্ত্বেও ‘তিব্বতে’ এখনও রক্ষিত আছে। ‘চিন’, ‘জাপান’ ও ‘মঙ্গোলিয়া’তেও কিছু কিছু বৌদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। সেগুলির ‘রূপকল্পনা’ ভারতেই করা হয়েছিল। তাছাড়া খাঁটি ‘তিব্বতি’, ‘চৈনিক’, ‘জাপানি’, ‘মাঞ্জুরীয়’ মূর্তি প্রচুর তৈরি করা হয়েছিল এবং এখনও সেগুলো পাওয়া যায়।
এখন দেখা যাক, ‘বৌদ্ধদের দেবদেবী’র উৎপত্তি কী ভাবে হয়েছিল এবং কীভাবেই বা তাঁদের মূর্তি কল্পিত হয়েছিল। এই বিষয়ে বুঝতে হলে ‘বৌদ্ধ তন্ত্রসাহিত্যের’ শরণাপন্ন হতে হয়। ‘বৌদ্ধতন্ত্র’ মতে সৃষ্টির আদি ও অকৃত্রিম উৎপত্তিস্থল হল একমাত্র ‘শূন্য’। এই শূন্যের অর্থ ‘সৎ বিজ্ঞান’ ও ‘মহাসুখ’, অর্থাৎ ‘শূন্য’ ‘চিৎসদৃশ ও আনন্দস্বরূপ’। এই ‘শূন্য’ ঘনীভূত হয়ে প্রথমে ‘শব্দরূপে’ দেখা দেন এবং পরে শব্দ থেকে পুনরায় ঘনীভূত হয়ে ‘দেবতা রূপ’ গ্রহণ করে থাকেন। ‘বৌদ্ধদের আদি তন্ত্র’ ‘গুহ্যসমাজগ্রন্থে’ এই বিবর্তনের একটি জাঁকালো বিবরণ দেওয়া আছে। সেখানে দেখা যায়, ‘কায়বাক্‌চিত্তবজ্র’ সমাধি গ্রহণ করছেন এবং ভিন্ন ভিন্ন সমাধিতে সমাধিস্থ হবার পরে এক-একটি শব্দ উত্থিত হচ্ছে। এবং সেই ধ্বনি ক্রমশ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে এক-একটি ‘ধ্যানী বুদ্ধ’-আকারে পরিণত হচ্ছে। জগতের কারণ রূপে ‘শূন্য’ নিজেকে প্রথমে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন। সেইগুলিই ‘স্কন্ধ’ নামে পরিচিত এবং ‘হিন্দুদের পঞ্চভূতের’ মতন ‘জগৎকারণরূপে’ গণ্য হয়ে থাকে। সেই ‘পঞ্চস্কন্ধের’ নাম - ‘রূপ’, ‘বেদনা’, ‘সংজ্ঞা’, ‘সংস্কার’ ও ‘বিজ্ঞান’। এই ‘পঞ্চস্কন্ধ’ও ‘অনাদি অনন্ত কাল’ থেকে বিদ্যমান এবং তাদের স্বভাব ‘শূন্যাত্মক’। কর্মবশে যখন সেই ‘পঞ্চস্কন্ধ’ একত্র হয় তখনই দৃশ্যমান জীবে পরিণত হয়ে থাকে। ‘শূন্য’কে ‘বজ্রযানে’ ‘বজ্র’ আখ্যা দেওয়া হয়। তার কারণ হল, ‘শূন্য’ ‘বজ্রের’ ন্যায় ‘দৃঢ়’, ‘সারবান’, ‘ছিদ্ররহিত’, ‘অচ্ছেদ্য’, ‘অভেদ্য’, ‘অদাহী’ ও ‘অবিনাশী’। ‘শূন্যের’ নামই ‘বজ্র’ এবং যে মার্গে ‘শূন্যের’ সঙ্গে মিলিত হওয়া যায় তাকেই ‘শূন্যযান’ বা ‘বজ্রযান’ বলা হয়। ‘বজ্রযানের অনুগামীরা’ এক পৃথক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে পরিগণিত হয়েছিলেন। ‘দেবমূর্তির দর্শন ও দেবদেবীর পূজা’ ‘বজ্রযানের’ এক বিশেষত্ব। যেহেতু ‘দেবতার দর্শন’ না হলে তাঁর রূপ জানা যায় না, তাই তাঁরা ‘দেবতার দর্শনে’ মনোযোগী হয়েছিলেন। কিন্তু, ‘দেবতার দর্শন’ সহজসাধ্য নয়। এর জন্য দরকার ‘অধ্যাত্মজ্ঞান’, ‘অত্মোন্নতি’ এবং ‘আধ্যাত্মিক সাধনা’। সেই জন্য ‘সাধন-মার্গে’ ‘বজ্রযানীরা’ এককালে ব্রতী হয়েছিলেন। সাধনার জন্য দরকার হয় ‘শারীরিক ও মানসিক পবিত্রতা’। এবং ‘দেবতা-দর্শনের’ জন্য ‘তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও অনুরাগ’। জগৎ ‘শূন্যময়’ বলে ‘সতত ভাবনা’, এবং জগতের কল্যাণের জন্য ‘সতত করুণাদ্রচিত্ত’ হওয়াও এই সাধনার পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন। যাঁদের এই গুণগুলি আছে তাঁরা বৌদ্ধই হোন বা অন্য ধর্মাবলম্বীই হোন, ‘দেবতা দর্শন’ করতে সক্ষম হন। প্রথমতঃ, ‘শরীর শুদ্ধি’ করে একটি ‘পবিত্র ও নির্জন স্থানে’ বসে সাধনা করতে হয়। যে ‘দেবতার দর্শন’ করতে আকাঙ্ক্ষা হয় সেই ‘দেবতার মন্ত্র’ জপ করতে হয় এবং তাঁর ‘বীজমন্ত্র’ হৃদয়দেশে চিন্তা করতে হয়। কিছুদিন অভ্যাসের পরে ‘চিত্ত’ স্থির হয় এবং সাধনার সময় দেবতা ছাড়া ও তাঁর ‘মন্ত্র’ ছাড়া অন্য কোনো দিকে মন ধাবিত হয় না। তারপর দৃঢ়চিত্তে একান্ত মনে ‘ধ্যান ও জপ’ করতে করতে ‘জাপক’ ক্রমশঃ ‘বাহ্যজ্ঞানশূন্য’ হয়ে যান। যখন ইন্দ্রিয়ের বহির্জগতের সঙ্গে সম্বন্ধ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় তখন তাকে ‘সমাধি’ বলে। সেই ‘সমাধি’তে ‘সম্পূর্ণ সুষুপ্তি’ অবস্থা থাকে। ‘জাগ্রত স্বপ্ন সুষুপ্তি’ অবস্থায় মানুষ তাঁর সময় যাপন করে থাকে। জাগ্রত অবস্থায় ইন্দ্রিয় বহির্জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্বন্ধ রাখে; স্বপ্ন অবস্থায় ইন্দ্রিয়গুলি সক্রিয় থাকে; কিন্তু ‘সুষুপ্তি অবস্থায়’ কোনো ধরনের চেতনা থাকে না। সেই সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় ‘জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন’ হয় এবং সেই সময় মানব শক্তির ভাণ্ডার ‘পরমাত্মা’র কাছ থেকে নিজের প্রয়োজনীয় শক্তি আহরণ করে থাকে। বৌদ্ধদের কথায় ‘জীবাত্মা’ হলেন ‘বোধিচিত্ত’ বা ‘করুণা’ ও ‘পরমাত্মা’ হলেন ‘শূন্য বজ্ৰ’ বা ‘আদিবুদ্ধ’। যখন কোন ‘সাধক’ দেবতা-দর্শনের উদ্দেশ্যে ধ্যান ও জপ করতে করতে ‘বাহ্যজ্ঞানশূন্য’ হয়ে যান, তখন তাঁর ‘বোধিচিত্ত’ ‘শূন্যের সঙ্গে’ মিলিত হয়। ‘শূন্যের সঙ্গে’ মিলিত হবার পরে ক্রমশঃ ‘পাঁচ প্রকারের নিমিত্তের দর্শন’ হয়ে থাকে। প্রথমে চিত্তাকাশে ‘মরীচিকার দর্শন’ হয়, দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘ধুমের (ধোঁয়া) আকার দর্শন’ হয়ে থাকে; তৃতীয় পর্যায়ে ‘খদ্যোতিকার মতন আলোকবিন্দুর দর্শন’ হয়, চতুর্থ পর্যায়ে একটি ‘দীপালোকের মতন দৃশ্য’ দেখা যায় এবং পঞ্চম বা শেষ পর্যায়ে ‘সতত আলোক’ দেখতে পাওয়া যায় - সেটা দেখতে ‘সম্পূর্ণ মেঘশূন্য আকাশের মতন’। এইভাবে ক্রমশঃ ‘ধ্যানমার্গে’ এগিয়ে চললে শেষে ‘পূর্ণসমাধি’ আসে এবং সেই সময়ে ‘সাধক’ হঠাৎ যে ‘দেবতার সাধনা’ করছেন, সেই ‘দেবতার দর্শন’ লাভ করেন। সেই ‘মার্গে’ তিনি আরও এগিয়ে গেলে দেবতাকে সবসময় দেখতে পান এবং নিজেকেও সেই ‘দেবতারূপে অনুভব’ করতে পারেন। এবং এই ‘দেবতা-যোগের ফলে’ তিনি উত্তরোত্তর ‘শক্তিসঞ্চয়’ করেন এবং নানাপ্রকার ‘লৌকিক ও অনুত্তর সিদ্ধি’ লাভ করে থাকেন। জগৎ ‘কারণ শূন্য’, সদাসর্বদা ‘পবিত্র ও শুদ্ধ স্বভাব’। তার কোনোরূপ ‘বাসনা’ নেই। ‘বোধিচিত্ত’ ‘বাসনাযুক্ত’ এবং অনেক প্রকারের। বাসনার তীব্রতায় ‘শূন্য ভাবনা’ করলে ‘শূন্যের যে বিকার’ হয় তা সেই বাসনা অনুযায়ীই হয়ে থাকে। এক বাসনায় যেমন এক ‘দেবতার দর্শন’ হয় সেইভাবে অন্য প্রকারের বাসনায় অন্য প্রকার দেবতার উদ্ভব হয়ে থাকে। এইভাবে নানাপ্রকারের ‘বোধচিত্ত’ থেকে নানাপ্রকার দেবদেবীর উৎপত্তি হয়ে থাকে। বাসনার যেহেতু অন্তঃ নেই, সেইজন্য দেবতাও অনন্ত। সেই ‘অনন্ত দেবতা’ নিয়েই ‘দেবসংঘ’ গঠিত হয়। কিন্তু দেবতা যতই হোন-না কেন তাঁদের উৎপত্তিস্থান কিন্তু এক ‘অনাদি অনন্ত শূন্যতা বা বজ্র’। ভাবনাবশে শূন্যে ‘স্ফোট’ বা ‘বুদ্‌বুদ’ হয়ে থাকে এবং তাকে বৌদ্ধেরা ‘স্ফূর্তি’ নামে অভিহিত করে থাকেন। ‘শূন্যের সেই স্ফূর্তি’ই ‘দেবতারূপে’ দেখা দেয়, কিন্তু তাঁরা স্বভাবতই নিঃস্বভাব, ঠিক ‘শূন্যেরই মতো’। তাই দেবতারা ‘শূন্যাত্মিকা’। ‘বৌদ্ধতন্ত্রে’ বলে ‘সাধনা’ করলে প্রথমে ‘শূন্যতার বোধ’ হয়, দ্বিতীয়ে ‘বীজমন্ত্রের দর্শন’ হয়, তৃতীয়ে ‘বীজমন্ত্র’ থেকে ‘বিম্ব’ অথবা ‘দেবতার অস্পষ্ট আকার’ দেখা যায় এবং অবশেষে ‘দেবতার সুস্পষ্ট মূর্তি দর্শন’ হয়ে থাকে। সেই মূর্তি ‘অতি মনোহর’, ‘সর্বাঙ্গসুন্দর’, ‘কল্পনার অতীত’, ‘স্বর্গীয় বর্ণে রঞ্জিত’ এবং নানাপ্রকার ‘দিব্য বস্ত্র অলংকার ও অস্ত্রশস্ত্রে শোভিত’। একবার দেখলে তা আর জীবনে বিস্মৃত হওয়া যায় না। সংক্ষেপে এটাই হল বৌদ্ধ দেবতার উৎপত্তির কথা৷ ‘দেবতাদর্শন’ একটা ‘আধ্যাত্মিক সাধনা’র ব্যাপার। এর জন্য অনেক সময় দিতে হয়, অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, সংযম করতে হয়, অনেক ‘যোগযাগাদি’ অভ্যাস করতে হয়। প্রাচীন ভারতে ‘দেবতার সাধনা’ যাঁরা করতেন তাঁরা সারা জীবনই সেই কাজে ব্যস্ত থাকতেন। সেটাই ছিল তাঁদের ‘মুখ্য পেশা’। ‘দেবতাদর্শন’কে কিংবা ‘সাধনা’কে ‘গৌণ পেশা’ করা যায় না, আর সেটা করলেও ‘সিদ্ধিলাভ’ হতে পারে না। গবেষকদের মতে, ‘দেবতাদর্শনের’ পিছনে এক বিরাট ‘দার্শনিক তত্ত্ব’ লুকিয়ে আছে। তবে সেটা সকলের জন্য ‘প্রশস্ত মার্গ’ নয়। সেটা ‘সাধকের মার্গ’, ‘যোগীর মার্গ’।
বৌদ্ধধর্মের দুটো মুখ্য বিভাগ আছে। একটা হীনযান ও অপরটা মহাযান। কালক্রমে এই দুটি যান প্রায় দুটি বিভিন্ন ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছিল। হীনযান প্রাচীন এবং মহাযান আধুনিক। হীনযান বুদ্ধের বচনের উপরে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু মহাযান দার্শনিক ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত। এই দুটি পথের ভিতরে নানা ধরনের বিভেদ আছে। কিন্তু মুখ্যতঃ একটিরই উল্লেখ এখানে করা দরকার। হীনযানে নিজের মুক্তিই প্রধান লক্ষ্যবস্তু, কিন্তু মহাযানে নিজের মুক্তির কোন স্থান নেই। জগতের সকল মনুষ্য, পশুপক্ষী ইত্যাদির মুক্তি আগে, তারপরে নিজের মুক্তি। জগৎ যতক্ষণ বন্ধনাবস্থায় থাকে ততক্ষণ তাদের মুক্তির জন্য চেষ্টা ও সর্বপ্রকারে ত্যাগস্বীকার করাই বোধিসত্ত্বের প্রধান কাজ। হীনযানে দেবদেবীর বালাই নেই। এমন কি বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের মূর্তি পর্যন্ত বুদ্ধের পরিনির্বাণের প্রায় চারশো বৎসরের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় না। গৌতম বুদ্ধ নিজে মূর্তিপূজার বিরোধী ছিলেন বললেও অত্যুক্তি করা হয় না। তাঁর ভাই নন্দ যখন তাঁকে প্রণাম করতে গিয়েছিলেন, তখন বুদ্ধ তাঁকে নিবৃত্ত করে বলেছিলেন যে প্রণামাদি দ্বারা তিনি সুখী হবেন না। তিনি সুখী হবেন তখনই যখন নন্দ পূর্ণ উদ্যমে সদ্ধর্মেব পালন করবেন। হীনযানে কিছুকিছু হিন্দু দেবতার নাম পাওয়া যায়। বুদ্ধ যখন পূর্ণজ্ঞান লাভ করেছিলেন সেই সময় ইন্দ্র এবং ব্রহ্মা এসে তাঁকে সেই দিব্যজ্ঞান পৃথিবীতে প্রচার করিতে অনুরোধ করেছিলেন। তাছাড়া ত্রয়স্ত্রিংশ স্বর্গরাজ্যেও দেবতাদের বাস ছিল। কুবের ও বসুধারার নামও দেখতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন প্রাচীন শিল্প সম্প্রদায়ে যদিও বুদ্ধের মূর্তি দেখা যায় না, তবুও বুদ্ধের ব্যবহৃত বস্তু ও প্রতীকের মূর্তি অনেক জায়গায় পাওয়া গেছে। বুদ্ধের পাগড়ি, পদচিহ্ন, বোধিবৃক্ষ, ধর্মচক্র ইত্যাদি বহুবিধ চিহ্ন পাথরে খোদিত দেখতে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে বুদ্ধগয়া, সাঁচি, ভারুত ও অমরাবতীর শিল্পই প্রধান। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে প্রথম শতকের মধ্যে এই সম্প্রদায়গুলি গঠিত হয়েছিল বলে গবেষকরা অনুমান করেন। খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতক পর্যন্ত ভগবান বুদ্ধের কোন মূর্তি নির্মিত করা হয়নি। তার বদলে তাঁর প্রতীকগুলোকেই পাথরে খোদাই করে রূপ দেওয়া হয়েছিল। বুদ্ধগয়ার বুদ্ধের জীবনবৃত্তান্তের ছবি, মায়াদেবীর স্বপ্ন এবং নানা প্রকারের যক্ষনাগের মূর্তিও পাওয়া গেছে। বুদ্ধের মূর্তি কোন্ শিল্পে প্রথম তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। কোনো কোনো পণ্ডিত বলেন গান্ধার ভাস্কর্যে গ্রিক বৌদ্ধেরা প্রথম ভগবান বুদ্ধের মূর্তি তৈরি করেছিলেন। আবার কোনো পণ্ডিত বলেন মথুরা ভাস্কর্যও প্রথম বুদ্ধের মূর্তি তৈরি করবার দাবি করতে পারে। তবে সব দিক লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে প্রথম বুদ্ধের মূর্তি তৈরি করা ভারতবাসীর পক্ষে সম্ভবপর ছিল না, কারণ সেটা ছিল একটু অসম্মানকর। কাজেই বোধ হয় সেই কাজটি বিদেশীয় বৌদ্ধদের দ্বারাই সম্ভব হয়েছিল। এই বিষয়ে অধিক বিচার নিষ্প্রয়োজন। গান্ধার ভাস্কর্যে মূর্তি প্রচুর পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলো সবই বৌদ্ধ এবং বুদ্ধের কাহিনীর পরিবেশে নিবদ্ধ। বুদ্ধের নানা ধরণের মূর্তি নানা মুদ্রায় নানাভাবে নানা অবস্থায় গান্ধারে দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়াও জম্ভল, মৈত্রেয়, হারীতী এবং বোধিসত্ত্বদের মূর্তিও গান্ধারে দেখতে পাওয়া যায়। মথুরা ভাস্কর্যেও প্রায় এইসব মূর্তিই দেখতে পাওয়া যায়, তবে সেগুলির প্রস্তুতপ্রণালী ছাঁচ ও ঢং আলাদা। সেখানেও বুদ্ধের নানামুদ্রায় নানাবিধ মূর্তি, তাঁর জীবনের দৃশ্যাবলী, কুবেরের মুর্তি এবং যক্ষ নাগাদির প্রতিমা দেখতে পাওয়া যায়। গান্ধার এবং মথুরা শিল্পকলার নিদর্শনগুলি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, গুপ্ত-সময়ের আগে পর্যন্ত হীনযানের প্রভাবই অধিক ছিল এবং মহাযানের দুই-একটি বোধিসত্ত্ব ছাড়া আর কোনো দেবতার বড়ো একটা লক্ষণ দেখা যায় না। গুপ্তকালেও সেই অবস্থাই বিদ্যমান ছিল। গুপ্তকালের বহু পরে পালদের রাজত্বের সময় বাংলায় এবং বিহারে নানাপ্রকারের মূর্তি প্রস্তুত হয়েছিল; এবং সেই মূর্তিগুলির অধিকাংশই ছিল বজ্রযানের দেবতামণ্ডলের। সেই মূর্তিগুলি থেকেই বোঝা যায় যে, বজ্রযান সেই সময় পূর্ণবিকাশ লাভ করেছিল এবং বজ্রযানের দেবদেবীরা বিশেষ লোকপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। সারনাথে, বিক্রমশীলায়, ওদন্তপুরীতে, কুর্কিহারে, বুদ্ধগয়ায়, রাঢ়দেশে, পূর্ববঙ্গে, আসামে ও উড়িষ্যায় অদ্ভুত অদ্ভুত মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল; এবং সেই মূর্তিগুলি ভারতের শ্রেষ্ঠ জাতীয় সম্পদ বলে পরিগণিত হতে পারে। যেসব দেবতার মূর্তি এইসব শিল্পসম্প্রদায়ে দেখা যায় তাঁদের মধ্যে ষড়ক্ষরী লোকেশ্বর, উচ্ছুষ্মজম্ভল, মঞ্জুশ্রী, তারা, অবলোকিতেশ্বর, বসুধারা, মারীচী, পঞ্চধ্যানিবুদ্ধ, বজ্রসত্ত্ব, হেব্রুক, পর্ণশবরী ইত্যাদির নাম করা যেতে পারে। বাংলা-বিহারের শিল্পকলা মুসলমান-আক্রমণের পরে নেপালে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। বড়ো বড়ো পণ্ডিতরা তাঁদের পুঁথি-পাঁজি, দেবতার বিগ্রহগুলি নিয়ে নেপালে পালিয়ে যান এবং সেখানে গিয়ে তাঁরা শত শত নতুন মঠ স্থাপন করেন। এতেই কোনোভাবে বৌদ্ধধর্ম ও বজ্রযান বেঁচে গিয়েছিল। তাঁদের সাথে বজ্রযানের দেবদেবীরাও একটু স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিলেন। বাংলার শিল্পকলা নেবারি শিল্পকলার সংমিশ্রণে এক নূতন রূপ ধারণ করে, এক অপূর্ব শ্রীতে মণ্ডিত হয়েছিল। নেবারিরা যে কত সুন্দর সুন্দর মূর্তি গড়েছিলেন তার আর ইয়ত্তা করা যায় না। একবার নেপালে কেউ ঘুরতে না গেলে সেটা কল্পনা করা অসম্ভব। অজন্তা ইলোরা এবং বৌদ্ধগুহাগুলিতেও কিছুকিছু বৌদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। কিন্তু সেই শিল্পীরা যে তান্ত্রিক বজ্রযানের দেবতাগুলির সঙ্গে বিশেষ পরিচিত ছিলেন সেটা মনে হয় না। হয়তো বজ্রযানের অভ্যুদয়ের আগেই এইসব গুহা নির্মিত হয়েছিল। কিংবা বাংলা, বিহার, আসাম, উড়িষ্যার, বজ্রযান এতদূর তখন পর্যটন করে উঠতে পারেনি। এখন, প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এই তান্ত্রিক বজ্রযানের উৎপত্তিস্থান কোথায় ছিল। তিব্বতিদের ধর্মপুস্তক বলে, তন্ত্রের উৎপত্তি হয়েছিল উড্ডিয়ানে। এই উড্ডিয়ান যে কোথায় ছিল সেটা সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। সাধনমালায় উড্ডিয়ান, কামাখ্যা, সিরিহট্ট (শ্রীহট্ট) ও পূর্ণগিরি এই চারিটি তন্ত্রের মুখ্য পীঠস্থান বলে উল্লেখ আছে। এই চারটি জায়গা বজ্রযোগিনীর পূজার জন্য বিখ্যাত ছিল। খুব সম্ভব এই চারটি পীঠস্থানে বজ্রযোগিনীর একটি করে মন্দিরও ছিল। আসামের কামাখ্যা বিখ্যাত; সিরিহট্ট আজকালকার শ্রীহট্ট; পূর্ণগিরি আসামে অবস্থিত পুণ্যতীর্থের সঙ্গে এক পর্যায়ে কেউ বলে থাকেন; কিন্তু চারিটি পীঠস্থানের প্রধান পীঠ উড্ডিয়ানের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। খুব সম্ভব এই উড্ডিয়ানের নাম কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে মূল নামটি লোপ পেয়ে গেছে। বিক্রমপুর পরগনায় একটি গ্রাম আছে তার নাম বজ্রযোগিনী। বজ্রযোগিনীর মন্দির বা পূজার প্রাধান্য সেই গ্রামে ছিল বলে বৌদ্ধদেবী বজ্রযোগিনীর নামে গ্রামের নামকরণ করা হয়েছিল বলে মনে হয়। বজ্রযোগিনী দেবীর সঙ্গে উড্ডিয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল। বজ্রযোগিনীর মন্দির তৈরি হবার আগেও গ্রামটির একটা নাম নিশ্চয় ছিল। সেই নামটি উড্ডিয়ান বলে কল্পনা করাই সমীচীন। যদিও নিশ্চয় করে কিছু বলা যায় না। কামাখ্যা, সিরিহট্ট, পূর্ণগিরি ও উড্ডিয়ানই ছিল তন্ত্রের আদি পীঠ। পূর্ববঙ্গ ও আসামই ছিল তন্ত্রের আদি স্থান। সেই স্থানে তান্ত্রিক বজ্রযানের উৎপত্তি হয়েছিল এবং সেই জায়গা থেকেই কাছের প্রদেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। নালন্দা, বিক্রমশিলা, সারনাথ, ওদন্তপুরী, জগদ্দল ইত্যাদি বিদ্যাপীঠগুলিতে বজ্রযানের অনুশীলন হত। সেসব জায়গায় তন্ত্র ও যোগমার্গের উপদেশ দেওয়া হত এবং ছাত্রও তৈরি করা হত। সমগ্র বাংলায় বিহারে এবং উড়িষ্যায় বজ্রযানের প্রভাব অত্যধিক ছিল এবং এইসব জায়গাতেই বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি সর্বাপেক্ষা বেশি পাওয়া যায়।
বৌদ্ধ সাহিত্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবদেবীর সাধনার কথা গুহ্যসমাজতন্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু সেই তন্ত্রখানির রচনায় অসঙ্গের কিছু হাত ছিল বলে গবেষকরা অনুমান করেন। অসঙ্গ খ্রীষ্টীয় চতুর্থ শতকে বিদ্যমান ছিলেন। তাঁর ভাই বসুবন্ধু, বৌদ্ধ জগতে সুপরিচিত। লামা তারানাথ নামক এক তিব্বতীয় বৌদ্ধ পণ্ডিতের মতে তন্ত্রের উৎপত্তি আগেই হয়েছিল, কিন্তু সেটা প্রায় তিনশো বছর সুপ্ত অবস্থায় ছিল এবং গোপনভাবে গুরুশিষ্যপরম্পরায় লুকিয়ে ছিল, পাল-রাজত্বের সময় সিদ্ধচার্যদের সাহায্যে সেটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। অষ্টম শতাব্দীতে বজ্রযানের বিশেষ শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল এবং খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সেটা প্রবলভাবে চলেছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুসলমান-আক্রমণ হয়েছিল এবং সেই সময়ে অনেক মঠ ও বিদ্যাপীঠ ধ্বংস হয়েছিল। তারপর থেকেই বজ্রযান ভারতে নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছিল এবং কিছুকাল পরে বিলুপ্ত হয়েছিল। বজ্রযানের অনুযায়ীরা হয় হিন্দু সমাজেমিশে গিয়েছিলেন, নয় তো মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। চৈতন্যমহাপ্রভু অনেককে বৈষ্ণব করে দিয়েছিলেন। একশো বৎসর আগেও ধারণা ছিল যে, বৌদ্ধদের ভিতর তন্ত্র ছিল না এবং তাঁরা দেবদেবীর উপাসনা করতেন না। কিন্তু এখন তন্ত্রসাহিত্যের গ্রন্থ কিছুকিছু প্রকাশ হওয়ায় সেই ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। এখনও শত শত বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্রন্থ অপ্রকাশিত রয়েছে। সেগুলি যতদিন না প্রকাশিত হয় ততদিন বজ্রযানের পূর্ণ স্বরূপ জানা সম্ভব হবে না।
(তথ্যসূত্র:
১- An Encyclopaedia of Buddhist Deities, Demigods, Godlings, Saints and Demons: With Special Focus on Iconographic Attributes (Emerging Perceptions in Buddhist Studies), Fredrick W. Bunce, D.K. Print World Ltd (১৯৯৪)।
২- Meeting the Buddhas: A Guide to Buddhas, Bodhisattvas, and Tantric Deities; Tony McMahon, Windhorse Publications (২০০৪)।
৩- বৌদ্ধদের দেবদেবী, বিনয়তোষ ভট্টাচার্য।)

No comments:

Post a Comment