আলাউদ্দিন-খিলজি(তথ্যসূত্র:১- The Life and Works of Sultan Alauddin Khalji, Ghulam Sarwar Khan Niazi, Atlantic (২০১৮)।২- The Reign of Alauddin Khilji, Translated from Zia-ud-din Barani's Tarikh-i-Firuz Shahi By A.R.Fuller and A.Khallaque, Pilgrim Publishers (১৯৬০)।৩- History of the Khaljis: A.D. 1290-1320, Kishori Saran Lal, Munshiram Manoharlal Publishers (২০১৯)।)
আলাউদ্দিন-খিলজি
ধনী হলেই লোকে রাজা হয়ে যেতেন না। ইতিহাস বলে অনেক ব্যবসায়ী হয়ত রাজার চেয়েও ধনী ছিলেন, কিন্তু তাঁরা রাজা ছিলেন না। ‘রাজা’ বা ‘মহারাজা’ বা ‘সম্রাট’ বা ‘বাদশাহ’ বা ‘সুলতান’ বা ‘নবাব’ হতে হলে নিজের ইচ্ছেকে লাগাম ছাড়া রূপ দিতে পারার মতো মেজাজ থাকার প্রয়োজন ছিল, যেমন ছিল ‘দিল্লির অধীশ্বর’ ‘আলাউদ্দিন খিলজি’র।
‘অতিরিক্ত মদ্যপান’ করবার পরেই ‘আলাউদ্দিন’ খামখেয়ালের রাশ ছেড়ে দিয়ে ‘খোয়াব’ দেখতে বসতেন। আর কেনই বা বসবেন না? সিংহাসন পাবার পর তিনি দেখেছিলেন যে তাঁর কোনও অভাব নেই। তাঁর খাজনা-খানায় দেদার ধনরত্ন, হাতিশালায় অসংখ্য হাতি, ঘোড়াশালায় সত্তর হাজারের বেশি ঘোড়া, হারেম উপচে পড়া রূপসী রমণী; আর তাঁর রাজ্যে আমোদ-প্রমোদ, গম্বুজ তৈরি, জলসার জৌলুস তো লেগেই ছিল। প্রতি বছরই তাঁর দুটি তিনটি করে পুত্র জন্মাত, শহরে বা শহরের আশেপাশে যেখানেই তিনি যেতেন, যেদিকেই তিনি তাকাতেন, দেখতে পেতেন হাজার হাজার লোক হাতজোড় করে তাঁর হুকুম তামিল করবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। তাই এমন মানুষ ‘খামখেয়ালের খোয়াব’ দেখবেন না তো কে দেখবে?
‘আলাউদ্দিনের’ মাথায় দুটো মারাত্মক খেয়াল চেপেছিল। একবার তাঁর মনে হয়েছিল, ‘নবী’র মতো তিনিও একটি ‘নতুন ধর্ম’ প্রচার করবেন এবং ‘তলোয়ারের সাহায্যে’ সবাইকে ঐ ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করবেন। একদিন ‘শরাবের মজলিশে’ বসে তিনি শুধু সেকথা ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি, কেন তাঁর ‘নবী’র মতো ধর্মপ্রচারের খেয়াল হয়েছে সেকথাও তিনি সাড়ম্বরে বলতেন। তিনি গর্বের সাথে বলতেন, ‘‘খোদাতালা নবীকে চারজন বন্ধু দিয়েছিলেন, আমাকেও দিয়েছেন উলুগ খান, জাফর খান, নসরত খান ও আলপ খানকে। এঁদের সাহায্যে, আমি ইচ্ছে করলেই নতুন ধর্মের জন্ম দিতে পারি।’’ নতুন ধর্ম সম্বন্ধে তাঁর ‘জল্পনা’ প্রায়ই শোনা যেত একটিমাত্র কারণে, তাঁর মনে হয়েছিল নতুন ধর্ম যদি সবাইকে জোর করে গ্রহণ করতে তিনি বাধ্য করেন তাহলে আর ভাবনা নেই, তাঁর মৃত্যুর পরেও ‘নবী’র মতোই চিরদিন তাঁর নাম থাকবে। ‘কেয়ামতের সময়’ পর্যন্ত। তাই ‘ইসলাম’ ও অন্যান্য কোন ধর্ম সম্বন্ধে তাঁর কোন আগ্রহ বা জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও তিনি দিনের পর দিন সেটা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন যে, তাঁকে এমন কিছু করতে হবে যার ফলে তাঁর মৃত্যুর পরেও মানুষ নির্বিবাদে সেই ধর্ম গ্রহণ করতে উৎসাহী হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত ‘আলাউদ্দিনের’ সেই খামখেয়াল মেটেনি। কিন্তু যদি সত্যিই তিনি সেই চেষ্টা করতেন? তরবারির সাহায্যে? সেটা চিন্তা করে ‘জিয়াউদ্দিন বারানী’ পর্যন্ত আতঙ্কে শিউরে উঠেছিলেন।
‘আলাউদ্দিনের’ আরও একটা খেয়াল চেপেছিল মাথায়। তাঁর সাধ জেগেছিল ‘বিশ্বজয়ী সিকন্দরের’ মতো ‘দ্বিতীয় সিকন্দর’ হওয়ার। ‘সুলতানের শখ’ বলে তাঁর সামনাসামনি কেউই কোনদিন কোন মন্তব্য করেননি, তবে আড়ালে তাঁর ‘আমির-ওমরাহেরা’ সবাই হেসেছিলেন, সামান্য ‘দিল্লীশ্বর’ হয়ে বিশ্বজয়ের সাধ! ‘আলাউদ্দিন’ অবশ্য বেশ উৎসাহ নিয়েই সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন এবং নিজের চিঠিপত্রে নিজেকে ‘দ্বিতীয় সিকন্দর’ বলে জাহির করতেও ছাড়েননি। ‘শরাবের মজলিশে’ তিনি আস্ফালন করে বলতেন, ‘‘এক একটা দেশ জয় করব আর এক একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর হাতে দিয়ে আরও এগিয়ে যাব।’’ শ্রোতারা সবাই জানতেন, সেটিও ‘আলাউদ্দিনের’ ‘বাজে খেয়াল’, যা কোনদিন সফল হবে না, শুধু তাই নয়, ‘শরাবের নেশা’ কেটে গেলে তিনি নিজেই সেটার অযৌক্তিকতা বুঝতে পারবেন। সেইজন্য ‘মদ্যপানের আসরে’ তাঁরাও ‘সুলতান’কে সেই বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। নানারকম উদাহরণ দিয়ে তাঁরা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে ‘সুলতানের মর্জিমতো’ কথা বলতেন। ‘আলাউদ্দিন’ ‘দিগ্বিজয়ী বীর’ এবং ‘দিল্লির সুলতান’ হয়েও তাঁর সেই শখ দুটিকে সফল রূপ দিতে পারেননি। তিনি সেটা দিতে পারলে হয়ত সত্যিই সর্বনাশা ঘটত।
(তথ্যসূত্র:
১- The Life and Works of Sultan Alauddin Khalji, Ghulam Sarwar Khan Niazi, Atlantic (২০১৮)।
২- The Reign of Alauddin Khilji, Translated from Zia-ud-din Barani's Tarikh-i-Firuz Shahi By A.R.Fuller and A.Khallaque, Pilgrim Publishers (১৯৬০)।
৩- History of the Khaljis: A.D. 1290-1320, Kishori Saran Lal, Munshiram Manoharlal Publishers (২০১৯)।)

No comments:
Post a Comment